ফিফা বিশ্বকাপ ক্রীড়াঙ্গনের সবচেয়ে বড় মঞ্চ। ২০২৬ সালের বিশ্বকাপে ৪৮ দলের সম্প্রসারিত ফরম্যাট চালু হওয়ায় প্রতিটি খেলোয়াড় জানে এবারই তারা জীবনের সবচেয়ে বেশী সমর্থকদেও সামনে নিজেদের তুলে ধরার সুযোগ পাবে।
এটি এমন এক মহাযজ্ঞ, যা কোনো খেলোয়াড়ের ক্যারিয়ারকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে এবং বড় অঙ্কের ট্রান্সফারের পথ খুলে দিতে পারে। বিশ্বকাপ চলাকালে নির্দিষ্ট কিছু খেলোয়াড়কে ঘিরে আগ্রহ ও উন্মাদনা তুঙ্গে পৌঁছে যায়।
যেমন ২০১৪ সালে কলম্বিয়ার হামেস রদ্রিগেজ বিশ্বকাপের গোল্ডেন বুট জিতে ৭৫ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দেন। চার বছর পরে ২০১৮ সালে কিলিয়ান এমবাপ্পে ফ্রান্সের বিশ্বকাপজয়ী অভিযানে মুখ্য ভূমিকা রেখে বৈশ্বিক সুপারস্টারে পরিণত হন।
তাহলে এবার কারা হতে পারেন পরবর্তী বড় নাম :
বিশ্বকাপ বরাবরই শুধু শিরোপা জয়ের মঞ্চ নয়; এটি অনেক সময় ফুটবলারের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে দেয়। ২০২৬ বিশ্বকাপেও এমন কিছু খেলোয়াড় নিজেদের পারফরম্যান্স দিয়ে ইউরোপের শীর্ষ ক্লাবগুলোর নজর কেড়ে নিতে পারেন।
ইয়ান দিয়োমান্দে (১৯), ফরোয়ার্ড, আইভরি কোস্ট
ক্লাব : আরবি লিপজিগ
সম্ভাব্য ট্রান্সফার মূল্য : ১০০ মিলিয়ন ইউরো
সম্ভাব্য গন্তব্য : লিভারপুল, পিএসজি
ইয়ান দিয়োমান্দের অভিষেক মৌসুমটি আরবি লিপজিগে দারুণ কেটেছে। আফ্রিকার নেশন্স কাপে কিছু ম্যাচ মিস করলেও তিনি মৌসুমজুডড়ে ২০টি গোলে সরাসরি অবদান রেখেছেন (গোল ও অ্যাসিস্ট মিলিয়ে) এবং তাঁর অসাধারণ ড্রিবলিং দক্ষতা দিয়ে দর্শকদের মুগ্ধ করেছেন।
গ্রেডিয়েন্ট স্পোর্টসের তথ্য অনুযায়ী, তিনি বুন্দেসলিগার পঞ্চম দ্রুততম খেলোয়াড় ছিলেন; তাঁর সর্বোচ্চ গতি ছিল ঘণ্টায় ৩৪.৮৫ কিলোমিটার।
বিশ্বকাপে আইভরি কোস্টের হয়ে তাঁর বাম উইংয়ে খেলার কথা, যেখানে বিপরীত প্রান্তে থাকবেন আমাদ ডিয়ালো। তবে তিনি ডান উইংয়েও সমান স্বাচ্ছ্যন্দ। গত মৌসুমে বেশিরভাগ সময় সেখানেই খেলেছেন। দিয়োমান্দে ইতোমধ্যেই স্বীকার করেছেন যে তিনি পিএসজির বড় ভক্ত, যা ভবিষ্যৎ ট্রান্সফার নিয়ে সম্ভাবনাকে আরও উসকে দিয়েছে।
রায়ান (১৯), ফরোয়ার্ড, ব্রাজিল
ক্লাব : বোর্নমাউথ
সম্ভাব্য ট্রান্সফার মূল্য : ৮০ মিলিয়ন ইউরো
সম্ভাব্য গন্তব্য : পিএসজি, লিভারপুল, আর্সেনাল ও এসি মিলান
ব্রাজিলের কোচ কার্লো আনচেলত্তির দলে হুয়াও পেড্রোর বাদ পড়া অনেককে বিস্মিত করেছিল। ইগর থিয়াগোর উত্থান এবং নেইমারের নাটকীয় প্রত্যাবর্তন এর পেছনে ভূমিকা রাখলেও, রায়ানও গুরুত্বপূর্ণ একটি কারণ ছিলেন। শেষ পর্যন্ত ব্রাজিলের আক্রমণভাগের শেষ স্থানটি তিনিই দখল করেন।
জানুয়ারিতে ৩০ মিলিয়ন পাউন্ডে বোর্নমাউথে যোগ দেওয়ার পর তিনি দুর্দান্ত সূচনা করেন। অল্প সময়েই সাতটি গোলে অবদান রেখে নিজের অসাধারণ গতি, শারীরিক শক্তি এবং সরাসরি আক্রমণাত্মক খেলার সামর্থ্য প্রদর্শন করেন। প্রিমিয়ার লিগে যোগ দেওয়ার এত দ্রুত তাঁকে দলে ভেড়াতে কোনো ক্লাবকে বিপুল অর্থ খরচ করতে হবে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী জানুয়ারি থেকে তাঁর চুক্তিতে ১৩০ মিলিয়ন পাউন্ডের রিলিজ ক্লজ কার্যকর হবে। তবুও ফুটবলে কখন কী ঘটে, তা আগে থেকে বলা কঠিন।
ক্যালেব ইয়িরেঙ্কি (২০), সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার, ঘানা
ক্লাব : এফসি নর্ডশেল্যান্ড
সম্ভাব্য ট্রান্সফার মূল্য : ৩০ মিলিয়ন ইউরো
সম্ভাব্য গন্তব্য : রিয়াল মাদ্রিদ, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, আর্সেনাল, ব্রাইটন
গত কয়েক বছরে ডেনমার্কের ক্লাব নর্ডশেল্যান্ড থেকে ইউরোপের শীর্ষ লিগগুলোর ক্লাবে একের পর এক খেলোয়াড় পাড়ি জমিয়েছেন। ক্যালেব ইয়িরেঙ্কি হতে পারেন সেই ধারার পরবর্তী নাম। স্বাভাবিকভাবে তিনি একজন সর্বগুণসম্পন্ন বক্স-টু-বক্স মিডফিল্ডার। তবে গত ছয় মাসে তিনি স্কাউটদের দেখিয়েছেন যে প্রয়োজনে সেন্টার-ব্যাক, রাইট-ব্যাক কিংবা রাইট উইং-ব্যাক হিসেবেও সমান কার্যকর হতে পারেন। জুন মাসে ওয়েলসের বিপক্ষে ১-১ গোলের ড্র ম্যাচে মিডফিল্ড থেকে নেমে গোল করার পর ঘানার নতুন কোচ কার্লোস কুইরোজ তাঁর ভূয়সী প্রশংসা করেন। বিশ্বকাপে তাঁকে মূলত তাঁর পছন্দের মিডফিল্ড ভূমিকাতেই ব্যবহার করার সম্ভাবনা বেশি।
আইয়ুব বুয়াদ্দি (১৮), সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার, মরক্কো
ক্লাব : লিলি ওএসসি
সম্ভাব্য ট্রান্সফার মূল্য : ৬০ মিলিয়ন ইউরো
সম্ভাব্য গন্তব্য : পিএসজি, আর্সেনাল, বায়ার্ন মিউনিখ
বুয়াদ্দির ক্যারিয়ার যেন দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে। মাত্র ১৮ বছর বয়সেই তিনি লিলির হয়ে দুই মৌসুমের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন, একাধিক পজিশনে খেলেছেন, ফ্রান্সের বদলে মরক্কোর হয়ে খেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং বিশ্বকাপ স্কোয়াডেও জায়গা করে নিয়েছেন। গত গ্রীষ্মে আর্সেনাল ও পিএসজি তাঁর প্রতি আগ্রহ দেখিয়েছিল। তবে তিনি উত্তর ফ্রান্সেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, যাতে নিজের উন্নয়ন অব্যাহত রাখতে পারেন।
সেই সিদ্ধান্ত সঠিক প্রমাণিত হয়েছে। ক্যারিয়ারের কিছু প্রাথমিক দুর্বলতা কাটিয়ে উঠে তিনি এখন আরও পরিপূর্ণ খেলোয়াড়। মাটিতে ও আকাশে দ্বৈরথ জেতার ক্ষেত্রে তিনি অসাধারণ, চাপের মধ্যে থেকেও ভালো পাস দিতে পারেন এবং একজন কেন্দ্রীয় মিডফিল্ডার হওয়া সত্ত্বেও তাঁর ক্রস দেওয়ার দক্ষতা বিস্ময়কর।
ইব্রাহিম মাজা (২০), সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার, আলজেরিয়া
ক্লাব : বায়ার লেভারকুসেন
সম্ভাব্য ট্রান্সফার মূল্য : ৫০ মিলিয়ন ইউরো
সম্ভাব্য গন্তব্য : ম্যানচেস্টার সিটি, লিভারপুল, আর্সেনাল
২০২৫-২৬ মৌসুমে লেভারকুসেনের হয়ে নিজের প্রথম মৌসুমেই দারুণ পারফর্ম করেছেন মাজা। মিডফিল্ডে জায়গার জন্য শক্তিশালী প্রতিযোগিতা থাকা সত্ত্বেও তিনি সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ৩২টি ম্যাচে শুরুর একাদশে ছিলেন। ২০ বছর বয়সী এই মিডফিল্ডার নিজের জায়গা ধরে রেখেছেন কারণ তিনি দুর্দান্ত ট্যাকলার, অফুরন্ত শক্তির উৎস এবং সবসময় গতির মধ্যে থাকেন। পাশাপাশি তিনি আক্রমণভাগের খেলোয়াড়দের উদ্দেশে নিখুঁত থ্রু-পাসও দিতে পারেন।
আলজেরিয়া দলে এখনও রিয়াদ মাহারেজ সবচেয়ে বড় তারকা হলেও, তরুণ মাজা এখন দলের হৃদস্পন্দনে পরিণত হয়েছেন এবং দলের প্রায় প্রতিটি আক্রমণাত্মক কার্যক্রমে তাঁর সম্পৃক্ততা থাকবে।
তারিক মুহারেমোভিচ (২৩), সেন্টার-ব্যাক, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা
ক্লাব : ইউএস সাসৌলো
সম্ভাব্য ট্রান্সফার মূল্য : ৪০ মিলিয়ন ইউরো
সম্ভাব্য গন্তব্য : ইন্টার মিলান, বার্সেলোনা
ইউরোপের বড় ক্লাবগুলো বর্তমানে বাঁ-পায়ের দক্ষ সেন্টার-ব্যাক খুঁজছে। তবে প্রতিষ্ঠিত খেলোয়াড়দের দলে ভেড়াতে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয়। সেই কারণে মুহারেমোভিচ অনেক ক্লাবের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু হতে পারেন। তিনি এখনও উন্নতির পথে রয়েছেন, কিন্তু তাঁর মধ্যে ভবিষ্যতে আলেহান্দ্রো বাস্তোনি ও নিকো শোটারবেকের মানের ডিফেন্ডার হয়ে ওঠার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে।
৬ ফুট ৪ ইঞ্চি উচ্চতার এই ডিফেন্ডার রক্ষণে শক্তিশালী ও আপসহীন। পাশাপাশি তাঁর বাঁ পায়ের পাসিং রেঞ্জ অসাধারণ। তিনি নিয়মিত দীর্ঘ পাসে বল অনেক দূরে পাঠাতে পারেন অথবা মাঠের বিপরীত প্রান্তে নিখুঁতভাবে বল সরিয়ে দিতে পারেন।
বসনিয়ার মূল একাদশে জায়গা পাওয়ার জন্য তিনি নিকোলা কাটিচের সঙ্গে লড়াই করছেন। তবে কিংবদন্তি স্ট্রাইকার এডিন জেকো ইতোমধ্যেই তাঁর প্রতিভা, উন্নতির পথ এবং ভবিষ্যতে বড় ট্রান্সফারের সম্ভাবনার প্রশংসা করেছেন।
লুকাস হেরিংটন (১৮), সেন্টার-ব্যাক, অস্ট্রেলিয়া
ক্লাব : কোলোরাডো র্যাপিডস
সম্ভাব্য ট্রান্সফার মূল্য : ১০ মিলিয়ন ইউরো
সম্ভাব্য গন্তব্য : এভারটন, ওয়েস্ট হ্যাম, আরবি লিপজিগ, স্পোর্টিং সিপি
মাত্র ১৮ বছর বয়সে হেরিংটন অস্ট্রেলিয়া ছেড়ে এমএলএসে যোগ দেন। দ্রুতই কোলোরাডো র্যাপিডসের মূল একাদশে নিজের জায়গা পাকাপোক্ত করেন এবং এরপর অস্ট্রেলিয়ার বিশ্বকাপ দলে জায়গা করে নেন। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, তিনি একজন সেন্টার-ব্যাক যে পজিশনে সাধারণত অভিজ্ঞতার গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি ধরা হয়।
গত তিন মাসে উত্তর আমেরিকায় তিনি দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দেখিয়েছেন। তাঁর শারীরিক সক্ষমতা, গতি এবং বল পরিষ্কারভাবে পাস করার দক্ষতা বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে যদি তিনি এই প্রতিভার সামান্য ঝলকও দেখাতে পারেন, তাহলে ইউরোপের বড় ক্লাবগুলো তাঁর জন্য আগ্রহ দেখাতে শুরু করবে। মাত্র ১০ মিলিয়ন ইউরোর সম্ভাব্য মূল্যে তিনি বড় ক্লাবগুলোর জন্য অসাধারণ এক “বাজেট ডিল” হতে পারেন।
ভিক্টর মুনিয়োজ (২২), ফরোয়ার্ড, স্পেন
ক্লাব : সিএ ওসাসুনা
সম্ভাব্য ট্রান্সফার মূল্য : ৪০ মিলিয়ন ইউরো
সম্ভাব্য গন্তব্য : রিয়াল মাদ্রিদ, বার্সেলোনা, নিউক্যাসল, এ্যাস্টন ভিলা
গত মৌসুমে ওসাসুনার হয়ে মুনিয়োজ নিজের ক্যারিয়ারের বড় উত্থান ঘটিয়েছেন। তিনি গত গ্রীষ্মে রিয়াল মাদ্রিদ থেকে ক্লাবে যোগ দিয়েছিলেন এবং দ্রুতই নিজের প্রতিভার প্রমাণ দিয়েছেন। তিনি চটপটে, তীক্ষè বুদ্ধিসম্পন্ন এবং সবসময় বলের খোঁজে থাকেন। ডিফেন্ডারকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা যেমন আছে, তেমনি দূরপাল্লার শট নিতে ভালোবাসেন।
এই গুণাবলির কারণেই তিনি স্পেন জাতীয় দলে বেঞ্চ থেকে নামার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হিসেবে জায়গা করে নিয়েছেন। সাধারণত এ ধরনের ব্যাকআপ খেলোয়াড়দের কাছ থেকে বড় প্রভাব আশা করা হয় না। তবে লামিস ইয়ামাল ও নিকো উইলিয়ামস ইনজুরি সমস্যার কারণে পুরোপুরি ফিটনেস ও ছন্দ ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করছেন। ফলে মুনিয়োজ বিশ্বকাপে নিজেকে প্রমাণের সুযোগ পেতে পারেন।
রিয়াল মাদ্রিদের কাছে তাঁকে ৪০ মিলিয়ন ইউরো দিয়ে পুনরায় দলে নেওয়ার একটি সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে বার্সেলোনাও তাঁর প্রতি আগ্রহী বলে জানা গেছে, পাশাপাশি প্রিমিয়ার লিগের বেশ কয়েকটি ক্লাবও তাঁকে পর্যবেক্ষণ করছে। এই গ্রীষ্মে যদি মুনিয়োজ তাঁর সুযোগগুলো কাজে লাগাতে পারেন, তাহলে মৌসুম শেষে তাঁর সামনে ইউরোপের বেশ কয়েকটি বড় ক্লাবের আকর্ষণীয় প্রস্তাব হাজির হতে পারে।
Leave a Reply