ড. হারুন রশীদ
টাকা শুধু বিনিময়ের একটি মাধ্যম নয়, এটি একটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও অর্থনীতির ভিত্তিমূল। কিন্তু যখন। যখন এই ভিত্তিমূলে আঘাত হানে ‘জাল টাকা’ নামক বিষফোড়া, তখন পুরো অর্থনৈতিক কাঠামোতেই অস্থিরতা তৈরি হয়। জাল টাকা হলো প্রতারণার এক ভয়াল রূপ, যা সাধারণ মানুষকে ক্ষতিগ্রস্ত করার পাশাপাশি রাষ্ট্রের অর্থনীতিকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দেয়। সম্প্রতি আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর অভিযানে কোটি কোটি টাকার জাল নোট উদ্ধার এবং বেশ কয়েকটি চক্রের গ্রেফতারের ঘটনা প্রমাণ করে, এই সমস্যাটি এখনো আমাদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। জাল টাকা মূলত অর্থনীতির জন্য এক ‘নীরব ঘাতক’। যখন বাজারে জাল নোটের সরবরাহ বাড়ে, তখন টাকার প্রকৃত মূল্য কমে যায়, যার ফলে মুদ্রাস্ফীতি দেখা দেয় এবং দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পায়। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ। এছাড়া, জাল নোটের বিস্তারের ফলে মানুষ নগদ লেনদেনে আস্থা হারায়, যা স্বাভাবিক বাণিজ্যিক কার্যক্রমকে ব্যাহত করে।
আগে জাল টাকা তৈরি হতো নিম্নমানের কাগজে, যা সহজেই চেনা যেত। কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তির অপব্যবহারে এখন এতটাই নিখুঁতভাবে জাল নোট তৈরি হচ্ছে যে, সাধারণ মানুষের পক্ষে খালি চোখে তা শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। পেশাদার চক্রগুলো আসল নোটের নিরাপত্তা সুতা, জলছাপ এবং প্রিন্টের সূক্ষ্ম বিষয়গুলো নকল করতে প্রায় সফল হয়ে গেছে। অনলাইনে বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এই জাল নোট বিক্রির সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে, যা সমস্যার নতুন মাত্রা যোগ করেছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে বাংলাদেশে এই জালিয়াত চক্র বর্তমানে ব্যাপক হারে তাদের জাল বিস্তার করেছে। অত্যন্ত নিপুণতার সঙ্গে তারা টাকা জাল করে বাজারে ছাড়ছে। দেখতে হুবহু আসলের মতো। কিন্তু পুরোটাই নকল। জালিয়াত চক্রের অনেককে পাকড়াও করা হলেও তারা আবার জামিনে বেরিয়ে এসে একই অপরাধের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। আইনের ফাঁক থাকায় এই ঘৃণ্য অপরাধীরা সহজেই পার পেয়ে যায়। এদের বিরুদ্ধে মামলা হলেও সাক্ষীর অভাবে তা অনেক ক্ষেত্রে প্রমাণ করা দুরূহ হয়ে পড়ে। আর এভাবেই জালিয়াত চক্র সহজেই বড় ধরনের অপরাধ করেও পার পেয়ে যায়।
জালিয়াত চক্রকে কতটা সক্রিয় তার প্রমাণ পাওয়া যায় সাম্প্রতিক ঘটনাবলি থেকে। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি চক্রকে আটক করেছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা। এর মধ্যে রয়েছে-চট্টগ্রামে ২০ কোটি টাকার জাল নোট উদ্ধার: গত ১৪ অক্টোবর, ২০২৫ তারিখে র্যাব চট্টগ্রাম নগরীর চান্দগাঁও এলাকা থেকে দেশি-বিদেশি আনুমানিক ২০ কোটি টাকা সমমূল্যের বিপুল পরিমাণ জাল মুদ্রাসহ চক্রের দুই সদস্যকে গ্রেফতার করে। এই জাল নোটগুলো অনলাইনে বিক্রি করা হতো এবং এতে বাংলাদেশি ১ হাজার, ২০০ ও ৫০ টাকার পাশাপাশি ইউএস ডলার, ইউরো, রিয়াল ও দিরহামের জাল মুদ্রা ছিল। গত ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ তারিখে রংপুরে ওষুধ কেনার সময় জাল টাকা ব্যবহারের অভিযোগে এক ব্যক্তিকে পুলিশ গ্রেফতার করে। তার কাছ থেকে আরো কয়েকটি ১ হাজার টাকার জাল নোট উদ্ধার করা হয়েছিল। গত ১৫ মে ২০২৫ তারিখে ঢাকা ও পঞ্চগড়ে অভিযান চালিয়ে একটি জাল নোট তৈরি কারখানার সন্ধান পায় ডিবি পুলিশ এবং এই চক্রের ছয় সদস্যকে গ্রেফতার করে। তাদের কাছ থেকে জাল টাকা তৈরির সরঞ্জামসহ বিপুল পরিমাণ জাল মুদ্রা জব্দ করা হয়েছিল। গত ১৪ অক্টোবর, ২০২৫ তারিখে শেরপুর প্রধান ডাকঘরে এক নারী সঞ্চয়পত্রের টাকা জমা দিতে এলে মেশিনে ১ হাজার টাকার ৫৩টি জাল নোট ধরা পড়ে।
আসল টাকা চেনার জন্য কিছু নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য লক্ষ রাখা জরুরি। যেমন আসল নোটে আলোর বিপরীতে তাকালে বাঘের মাথা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের মনোগ্রামের স্পষ্ট জলছাপ দেখা যায়, যা নকল নোটে সাধারণত অস্পষ্ট বা নিম্নমানের হয়। আসল টাকা বিশেষ নিরাপত্তামূলক কালিতে ছাপা হয়, যা হাত দিয়ে স্পর্শ করলে খসখসে বা উঁচু-নিচু অনুভূত হয়। নকল নোটে সাধারণত এই অসমতল ভাব থাকে না। লাইটের নিচে ধরলে আসল নোটের নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় রেডিয়ামের প্রলেপ জ্বলজ্বল করে ওঠে, যা জাল নোটে হয় না। এছাড়া, আসল নোটের কাগজ টেকসই হয় এবং মুষ্টিবদ্ধ করে কিছুক্ষণ পর ছেড়ে দিলে তা সাধারণ কাগজের মতো ভাঁজ হয়ে যায় না। জাল নোট সহজেই ভাঁজ হয়ে যায় বা পানিতে ভেজালে দ্রুত নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
Leave a Reply