গোদাগাড়ী (রাজশাহী)প্রতিনিধিঃ
নেতাকর্মীদের সঙ্গে টেলিগ্রাম গ্রুপে কথা বলছিলেন রাজশাহী-১ (গোদাগাড়ী-তানোর) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ওমর ফারুক চৌধুরী। আলোচনার বিষয়বস্তু ক্ষমতায় থাকাকালে কে কোন খাত থেকে টাকা কামিয়েছেন। সেখানে একজন ফারুক চৌধুরীকে বলে বসেন, ‘টাকা আপনি খাইছেন, ওরে (ওদের) হাত দিয়া।’ আর এতেই মেজাজ হারিয়ে ফেলেন ফারুক চৌধুরী।
গণঅভ্যুত্থানের পর থেকেই আত্মগোপনে থাকা সাবেক এই সংসদ সদস্য ফয়সাল সরকার অমি (৩৫) নামের ওই ব্যক্তিকে বলেন, ‘তুই সামনে পড়িস। তোর অবস্থা কিন্তু একদম খারাপ হয়ে যাবে।’ ফারুক চৌধুরীর এই কথাকে হুমকি মনে করে বুধবার তানোর থানায় লিখিত অভিযোগ করেছেন ফয়সাল সরকার। এতে ফারুক চৌধুরীসহ মোট ৬ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
ফারুক চৌধুরী নেতাকর্মীদের সঙ্গে গ্রুপে কথা বলছিলেন গত সোমবার (৯ মার্চ) রাত ১১টার দিকে। তাদের কথোপকথনের রেকর্ডটি পাওয়া গেছে। এতে শোনা যায়, তানোর পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবুল বাসার সুজন চাকরি দেওয়ার নামে অনেক টাকা তুলেছেন বলে আলাপ হচ্ছে। এ সময় ফয়সাল বলেন, ‘আমারই চাচাত ভাইয়ের টাকা নিয়ে গেছে।’
ফারুক চৌধুরী জানতে চান, ‘কার সামনে কে টাকা নিয়ে গেছে?’ ফয়সাল বলেন, ‘সামনে না, আমারই চাচাত ভাইয়ের চাকরি হয়েছে, আমি হিরোর ছোট ভাই লিডার, হাইস্কুলে। আমার চাচাত ভাই ফজলু। ফজলু ১২-১৩ লাখ টাকা দিয়েছিল সুজন ভাইয়ের হাতে, পিয়নের চাকরিটা নেওয়ার জন্য।’
ফারুক চৌধুরী বলেন, ‘সুজন যদি নিয়ে যেয়ে থাকে সেই টাকা, তাহলে কি আমার নাম হলো?’ এ সময় ফয়সাল বলেন, ‘না, কিন্তু এখানে ফল্ট তো আপনার দেখতে পাব। কারণ, আমরা তো জানব এই টাকাটা আপনার হাতে যাচ্ছে। কারণ আপনি এমপি। সুজন ভাই আপনার লোক।’
ফারুক চৌধুরী পাল্টা প্রশ্ন করেন, ‘এখন কেউ যায়ে বললেই এটা হবে?’ ফয়সাল বলেন, ‘এখন এটা আপনি বোঝাবেন কীভাবে? দশটা মানুষকে। আমি বিশ্বাস করলাম আপনাকে। কিন্তু দশটা ভোটারতো এটা বিশ্বাস করবে না।’ তখন ফারুক চৌধুরী বলেন, ‘হ্যাঁ, হয়ত তারা টাকা নিয়েছে এবং এটা হয়ত দলেই খরচ করেছে বা করেনি। কিছু টাকা রেখেও দিয়েছে। হতেও পারে। কিন্তু বদনামটা আমার হবে কেন? নিজেদের বদনাম করলে গায়ের থুতুটা নিজেদের মুখের ওপরেই পড়ে।’
তিনি বলতে থাকেন, ‘হ্যাঁ, কিছু লোক তো কিছু খারাপ কাজ করেছেই। তারা তো কিছু মানুষের উপকারও করেছে। কিছু হয়ত দলের দিকেই টাকা খরচ করেছে। এখন এগুলো নিয়ে কথা বলে লাভ কী আছে? আমাদের এইখানে কী হয়েছে? অন্যান্য জায়গাতে এর চেয়ে খারাপ কাজ হয়েছে।’
এ সময় ফয়সাল বলেন, ‘চাচা, আমি একটু কথা বলতাম আপনি অনুমতি দিলে।’ ফারুক চৌধুরী বলেন, ‘না, এত রাতে আর কথা বলা যাবে না। তুমি পরে কথা বলো। আমি কি কোনো জায়গাতে গিয়ে কোনো অবৈধ কাজ করেছি? কোনসময় মদের বোতল নিয়ে বসেছি? কোন মেয়ের হাত ধরে টেনে নিয়ে গেছি? কেউ বলতে পারবে এগুলো কথা? তাহলে শুধু একটা রেকর্ড আছে যে, দশজন টাকা তুলেছে; এই টাকাটা ফারুক চৌধুরী খাইছে, এই দোষ! এটা কোনদিন হয়?’
ফয়সাল বলেন, ‘ওগলা (ওইগুলোÑ লোকদের ওপরে তো দায়িত্ব ছিল চাচা আপনার। আপনি তো ওগলা লোক দিয়েই তো সংগঠনটা চাঙা করে থুইছিলেন।’ এ সময় রেগে গিয়ে ফারুক চৌধুরী বলেন, ‘ওই, তুই কথা বলিস না তো। তোর কথা শুনলে আমার বিরক্ত লাগে।’
ফয়সাল বলেন, ‘চাচা, সত্যি কথা বললে খারাপ লাগে চাচা। আমি বুঝি তো, সমস্যা নাই।’ এ সময় আরও রেগে গিয়ে ফারুক চৌধুরী বলেন, ‘তুই সামনে পড়িস। তোর অবস্থা কিন্তু একদম খারাপ হয়ে যাবে। তুই যা তা বলবি না আমার সামনে।’ এ সময় ফয়সাল বলেন, ‘ চাচা, কী খারাপ করবেন আপনি? মার্যা ফেলে দিবেন? তো ফেলে দিবেন। আপনার হাতে যদি মৃত্যু থাকে, মরে যাব। সমস্যা কী? টাকা আপনি খাইছেন, ওরে হাত দিয়া। এখন আপনি ওগলা বুইলতে পারছেন না। সঠিক কথা বুইললে খারাপ লাগে।’ এ সময় আরও রেগে গিয়ে ফারুক চৌধুরী বলেন, ‘এই গ্রুপ বন্ধ করে দে।’ এরপর ‘জ্বী চাচা’ বলে একজন গ্রুপ কল কেটে দেন।
এ সময় ফয়সাল বুধবার তানোর থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দেন। এতে তিনি লেখেন, সরকার পরিবর্তনের পর থেকেই ওমর ফারুক চৌধুরী তাকে অনলাইকে ভয়ভীতি ও হুমকি দিয়ে আসছিলেন। ৯ মার্চ রাতে তাকে অনলাইনে গ্রুপকলে যুক্ত হয়ে কথা বলার জন্য জানান। তিনি সরল বিশ্বাসে গ্রুপকলে যুক্ত হয়ে তানোর উপজেলায় শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ বাণিজ্য এবং গভীর নলকূপের টাকা-পয়সার বিষয়ে প্রতিবাদ করেন। এ সময় ফারুক চৌধুরীসহ অন্যরা তাকে গালিগালাজ করেন। তাকে প্রকাশ্যে ও অনলাইনে বিভিন্ন রকম ভয়ভীতি প্রদর্শনসহ প্রাণনাশের হুমকি দেন। তারা যে কোনো সময় তার বড় ধরনের ক্ষতি করতে পারেন।
সংসদ সদস্য থাকাকালে নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণে প্রায়ই গণমাধ্যমের শিরোনাম হতেন ওমর ফারুক চৌধুরী। বেফাঁস মন্তব্য এবং গায়ে হাত তোলা ছিল তার অভ্যাস। পলাতক অবস্থায়ও মেজাজ দেখালেন।
এ বিষয়ে তানোর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এসএম মাসুদ পারভেজ বলেন, ‘অভিযোগটা পেয়েছি। আমরা তদন্ত করে ব্যবস্থা নিচ্ছি।’
তানোরে একসময় ওমর ফারুক চৌধুরীর হয়ে সব নিয়ন্ত্রণ করতেন আওয়ামী লীগ নেতা আবুল বাসার সুজন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিয়োগ বাণিজ্য করেই তিনি কোটি কোটি টাকা তুলেছেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে তিনবারের সাবেক সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ওমর ফারুক চৌধুরী আত্মগোপনে। তিনি পালিয়ে গেছেন ভারতে।
তবে আবুল বাসার সুজন এখনও প্রকাশ্যেই আছেন। এখনও তিনি তানোর ও মান্দায় পশুহাট নিয়ন্ত্রণ করেন। তার নিয়োগ বাণিজ্য নিয়েই টেলিগ্রাম গ্রুপে ওই কথোপকথন হচ্ছিল। বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে আবুল বাসার সুজনের মোবাইল নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা করে সংযোগ পাওয়া যায়নি। বিষয়টি নিয়ে ভারতে অবস্থানরত ওমর ফারুক চৌধুরীর সঙ্গেও কথা বলা যায়নি।
Leave a Reply